• মঙ্গলবার ২৬শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ১০ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম

    একটি জোতদার বাড়ির আত্মকাহিনী

    লেখক- (মাসুদ হাওলাদার) : | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫:৪৭ অপরাহ্ণ

    একটি জোতদার বাড়ির আত্মকাহিনী

    (১ম পর্ব)
    আমি এক “জোতদার বাড়ি” অনেকে আমাকে বাইশরশি জমিদার বাড়ি নামেই চিনে।আজ থেকে ২ শতাধিক বছর পূর্বে অর্থাৎ আঠারো শতকের শুরুতে আমি যতোটুকু মনে করতে পারছি সাহা বংশীয় লবন ব্যবসায়ী দুই ভাই নীলকণ্ঠ সাহা ও বৈকণ্ঠ সাহা অনেক অর্থ-কড়ি ব্যয়ে আমাকে নির্মাণ করেন। জেলা ফরিদপুর হতে ৩৫ কি,মি দক্ষিণ -পূর্বে এবং সদরপুর উপজেলা হতে ৩ কি,মি দক্ষিণে বাইশরশিতে আমার অবস্থান। তৎকালীন সাহা বংশীয় ব্যবসায়ী লবন ব্যবসার মাধ্যমে ব্যাপক অর্থের মালিক বনে যান। এতে ফরিদপুর ও দক্ষিণ বাংলার বরিশাল অঞ্চলে ক্রমান্বয়ে ২২ টি পরগণা ক্রয় করে এ অঞ্চলে তারা জমিদার প্রথার গোড়াপত্তন করেন! ফরিদপুর ও বরিশালের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাসাদসম অট্টালিকা নির্মাণ করে তারা স্থানীভাবে বসবাস ও রাজত্ব কায়েম করেন। পরবর্তীতে তাদের পদবি সাহা থেকে ইংরেজ কর্তৃক দুই ভাই নীলকন্ঠ রায় বাহাদুর ও বৈকণ্ঠ রায় বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। নীলকন্ঠ রায় বাহাদুর ও বৈকণ্ঠ রায় বাহাদুর উনারা বরিশাল হতে এসে এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন।

    ফরিদপুর ও বরিশাল ছাড়াও কখনো বা জমিদারা খাজনা আদায় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কলকাতা থেকেও পরিচালনা করে থাকেন । আমার অধীশ্বরদ্বয় প্রায় ৫ হাজার শতক জমির উপর ৫ টি শান বাধানো পুকুর ২ টি দুর্গাপূজা পূজামণ্ডপ, ১ টি স্যাম রাই মন্দির, ১ টি দোল মন্দির, ১ টি পানশালা ও ১৪ টি দেড় ফুট পুরুত্বের দেওয়ালে আবৃত সুদৃশ্য দালান রুপে আমাকে তৈরি করেন। আমার পুরো শরীর জুড়ে দেড় ইঞ্চি মাপের শক্ত ইট, চুন, সুড়কি ও বৃটেন থেকে আনা লোহার বিম ব্যবহার করা হয়। সেবারে আমাকে চমৎকার ভাবে সাজাতে উপমহাদেশের নামকরা নকশা শিল্পীদেরও আনা হয়েছিলো। তাদের অসাধারণ কারুকাজের মাধ্যমে আমি হয়েছিলাম অসামান্য রুপের অধিকারী এক জমিদার বাড়ি নামকরণে। শুরুতেই আমার রুপে গুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। অল্পদিনের মধ্যেই আমার সুখ্যাতি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আর ক্রমান্বয়ে বাইশরশি নামক গ্রামে আমাকে দেখার জন্য লোকজন জটলা পাকাতে থাকে। এতে দিনদিন উপস্থিত দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। কিন্ত আমাকে দেখতে আসা সবাইকে নানান বিড়ম্বনার পড়তে দেখা যেতো। জমিদারদের ফরমায়েশ অনুযায়ী এখানে কাউকেই পায়ে জুতা বা খড়ম পরে আসতে দেওয়া হতোনা।

    আমার উত্তর- দক্ষিণ, পূর্ব -পশ্চিম পাশের পুকুরগুলোর জলও কাউকে পান করতে দেওয়া হতোনা। আমার পূর্ব দিকের একমাত্র সড়ক দিয়েও কেউ যানবাহনে আরোহন করতে পারতোনা। এ অঞ্চলে অন্য যে কেউ জুতা বা খড়ম পায়ে দিয়ে অথবা ঘোড়া কিংবা যানবাহনে আরোহন করতে পারবে এসব ছিলো এখানকার জমিদার ও সাধারণ মানুষের ভাবনার বাইরে। আমি এই প্রথার ছিলাম ঘোর বিরোধী কিন্ত জমিদারদের ভয়ে মুখ খুলে তা বলতেও পারতাম না। তাইতো শতাব্দীর পর শতাব্দী এই কুপ্রথা মুখ বুঝেই সয়েছি। শীতের প্রাক্কালে যখন দুর্গাপুজোর আয়োজন চলতো বিভিন্ন পরগণা থেকে তখন রাজকীয় আগন্তুকদের সমাগম ঘটতো আমাকে ঘিরে। পাশাপাশি দুই মন্দিরেই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। পুজা উপলক্ষে দুই মন্দিরে মহিষ বলি করা হতো। অভ্যাগতদের অন্দরমহল ও পানশালাতে তাদের অবস্থান ছিলো চোখে পড়ার মতো। পুরো মাসব্যাপী দুর্গাপুজার উৎসব হিসেবে বিভিন্ন যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল হতে নামকরা যাত্রাপালাকারদের সমাগম ঘটতো আমার বুকের ভিতরটাতেই। এছাড়া জমিদার বাবুদের মনোরঞ্জনের জন্য কলকাতা থেকে উচ্চ মূল্যে দিপালী, বাসন্তী ও যশোদা বাইজিকে ভাড়া করে আনা হতো। মকমলের পোশাক ও বাহারী অলংকারে তাদের পুরো শরীর আবৃত করা হতো। পুরো মাসজুড়ে তখন অন্দরমহলে কখনোবা পানশালাতে নাচ গানের আসর জমতো এবং তা ভোররাত পর্যন্ত বিরামহীনভাবে চলতো। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ও এই অনুষ্ঠান উপভোগ করতো পরম আগ্রহে। অনুষ্ঠান উপভোগের পাশাপাশি হরেকরকম খানাপিনা ও শরাব পান চলতো পুরোদমে। কেউবা আবার বাইজিদের নাচের সঙ্গী হয়ে নাচ-গান ও ভালোলাগার অনুভূতিতে ঝম্প দিতো পুনরায় জ্ঞান ফেরা অবধি।

    ইরানী আতরের সুগন্ধি ও অলংকারের রিনিঝিনি শব্দে উপস্থিত সবাই মাতোয়ারা হয়ে যেতো। উন্নত পোশাক, সুগন্ধি ও ভারি অলংকার ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ করা হতো। এরা খাড়ু, পায়জোড়, ঘুঙুর, গজমতিরহার, বাজুবন্ধ, বেলকুড়ি, মাকাড়ি, লটকন, বালি, পাশা, বেশর, গলাবন্ধ, চম্পাকলি, তারাহারা, সাতনরী, পুষ্পহার, মোহনমালা তাতনচুড়ি, মল, চিক, কলগা, কিরিট, শিরোমণি, শিথিমৌর, গোবেয়ক ও কুলোহার নামক অলংকার ব্যবহার করতো। অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে পানশালা ও অন্দরমহলের ত্রিসীমানা ঘেষা সাধারণ মানুষের জন্য ছিলো বেশ বিপদজনক। আঠারো শতকের শুরুতে উপমহাদেশে যাত্রাপালার ছিলো স্বর্ণযুগ। এসময় পুরো বাংলার আনাচে কানাচে যাত্রাপালা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। শিশুরাম অধিকারী, পরমানন্দ অধিকারী, গোবিন্দ অধিকারী ছিলেন কৃষ্ণ যাত্রার পালাকার।

    রামযাত্রা, সীতার বারোমাসি, নৌকা বিলাস, নিমাই সন্যাস ও রাধার বারোমাসি ছিলো উল্লেখযোগ্য যাত্রাপালা। এছাড়াও অকালের দেশ, বাঙ্গালী রক্ততিলক, সমাজের বই, বাঙ্গালী বিচারক, দর্পহারী যাত্রাপালা ও অনুষ্ঠিত হতো! এসময়ে নট্ট অপেরা ও ভাণ্ডারী অপেরার বেশ সুখ্যাতি ছিলো। অনুষ্ঠানের সময় ছাড়াও সারাবছর আমার দারুণ কদর ছিলো। বাড়ির কারপরদাজেরা সবসময় আমাকে পরম মমতায় যত্ন করতো। আমার শরীরে ধুলাবালি পুকুরের স্বচ্ছ জল দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার করে দিতো! সন্ধ্যায় মাদল, কাশি, শঙখের ধ্বনি ও ধূপগন্ধে আমার মনটা ভরে যেতো। আমার ভিতর বসবাসকারি লোকদের দুঃখ, কষ্ট, সুখ ও ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে আজও মুমূর্ষু অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি।আমি তোমাদের শোনাতে চাই আমার বুকের ভিতরটাতে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনা ও দুর্ঘটনার কথা!

    তোমরা কি শুনবে আমার মনে জমে থাকা কথাগুলো?

    চলবে————–

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ৫:৪৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০

    shikkhasangbad24.com |

    advertisement

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    advertisement
    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১ 
    advertisement

    সম্পাদক ও প্রকাশক : জাকির হোসেন রিয়াজ

    সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বাড়ি# ১, রোড# ৫, সেক্টর# ৬, উত্তরা, ঢাকা

    ©- 2021 shikkhasangbad24.com all right reserved